অটোমান রাজধানীতে একদিন

Alamin Moni

Alamin Moni

Writer & Researcher

এদিরনে,অটোমান সম্রাজ্যের তৃতীয় রাজধানী। ১৩৬৯ সাল থেকে ১৪৫৩ সালে ইস্তাম্বুল জয় এর পূর্বে পর্যন্ত এদিরনে ছিলো অটোমান সম্রাজ্যের রাজধানী। গ্রীক পৌরাণিকে বলা হয়েছে আগামেমন এর পুত্র ওরেস্টিস এই শহরটিকে ওরেস্টিয়াস নামে প্রতিষ্ঠা করেন। সে যাই হোক, ১৩৬৯ সালে অটোমান সুলতান প্রথম মুরাদ শহরটি জয় করেন এবং এর নাম দেন “এদিরনে”।এদিরনে উত্তর সীমান্তবর্তী একটি শহর যার সাথে যুক্ত গ্রীস এবং বুলগেরিয়া এর সীমান্ত।
আমি এতোকিছু জানতাম না এদিরনে সম্পর্কে। ডর্ম থেকে যখন বলা হলো এদিরনে ঘুরতে যাবে তখন কোনোকিছু না ভেবেই নাম দিয়েছিলাম কোথাও ঘুরতে যাবো এই ভেবে।
তারিখটা ১৪ এপ্রিল এবং বাংলা ১লা বৈশাখ। ভোর ৫:৩০ টায় রওনা দেওয়ার কথা থাকলেও যথারীতি ৫ টার এলার্ম বন্ধ করে আবার চোখ বন্ধ করেছি। হঠাৎ ডর্মের ম্যানেজারের ডাকে ধড়পড় করে উঠেই দেখি ৫:২০ পার হয়ে গেছে। তাড়াহুড়া করে ৫.৩৫ এ নিচে নেমে দেখি আমি সহ মাত্র ৪-৫ জন এসেছে। যাক বাবা খুব বেশি দেরি করিনি। কিছুটা সময় পেয়ে ফজরের নামাজটা পড়ে নিলাম।

ভোর ৫:৫০। ডর্মের বাস এ করে যাত্রা শুরু হলো অন্য এক শহরের উদ্দেশ্যে। বাসের মধ্যেই হালকা কিছু নাস্তা দেওয়া হলো। এর মধ্যেই নেটে এদিরনে সম্পর্কে যা তথ্য নিয়েছি তাতেই অবাক হয়ে ভাবছি ইতিহাসের কত কাছে যাচ্ছি আমি।মনের মধ্যে উত্তেজনাটা বুঝি একটু বেড়েই গেছে এতোকিছু তথ্য পেয়ে।

কিছুক্ষণের মধ্যে ইস্তাম্বুল শহরের বড় বড় বিল্ডিংগুলো পিছনে ফেলে বাস চলছে ফাকা কোনো রাস্তা ধরে। রাস্তার দুই ধারে উঁচু নিচু পাহাড়ের ধারে আবাদি জমি, দেখেই বোঝা যায় গ্রামীণ পরিবেশ। আমার কাছে মনে হচ্ছে যেনো পাহাড়ের বুকে সবুজ আর হলুদ চতুর্ভুজ বিছিয়ে রেখেছে কেউ। অবাক হলাম এটা শুনে যে হলুদ শস্যগুলো সরিষাক্ষেত।আসলে আমার অবাক হওয়ার মাত্রাটা হয়তোবা অনেক বেশিই কারন আজই প্রথম তুরস্কের গ্রাম দেখছি আর প্রায় সাড়ে ছ মাস আগে নিজের গ্রাম ছেড়ে এসেছি। দেখতে দেখতে কখন ঘুমিয়ে পড়েছি সে খেয়ালই ছিলো না..!

যখন ঘুম ভাঙলো তখন ঘড়িতে প্রায় ৮:৩০। আমাদের বাস এদিরনে শহরে প্রবেশ করেছে। শহর হলেও কেমন ফাকা ফাকা লাগছিলো। ইস্তাম্বুলের মত অত লোকজন নেই। ৮:৫০ এর দিকে আমাদের বাস ভ্রমণ স্থগিত করে আমাদের ডর্মের এদিরনে শাখায় গিয়ে নাস্তা করলাম। এরপর ৮:৩০ টার দিকে আবার বাসে উঠলাম। গন্তব্য কোথায় তা আমার জানা নেই। আসলে আমার চোখ তখন খুজছিলো ঐতিহাসিক কোনো স্থাপনা। কিন্তু এখন পর্যন্ত সেরকম কিছু চোখেই পড়লোনা।

পরবর্তীতে যখন আমাদের বাস থামলো তখন আমরা “দ্বিতীয় বেয়াজিদ স্বাস্থ্য মিউজিয়াম” এর সামনে। শিক্ষার্থীদের জন্য এতে প্রবেশ হয়তোবা ফ্রি কারন আমাদের কোনো টিকেট ছাড়াই ঢুকতে দিলো। গেট দিয়ে ঢুকেই এক মজার দৃশ্য চোখে পড়লো। দুটি ময়ূর আপন মনে ঘাসের উপর ঘুরে বেড়াচ্ছে! এত কাছ থেকে ময়ূর দেখা এই প্রথম।

মিউজিয়ামটি অনেক কয়েকটি কমপ্লেক্স জুড়ে। সুলতান দ্বিতীয় বেয়াজিদ এটি নির্মাণ করেছিলো। এটি ছিলো বর্তমান সময়ের মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল এর মতো। এখানে ১৮ জন শিক্ষার্থী থাকার জন্য ১৮ টি রুম,১টি শ্রেণীকক্ষ, শিক্ষকের জন্য রুম, দর্শনার্থীদের রুম, ব্যবহারিক পদার্থবিজ্ঞান রুম, ব্যবহারিক চিকিৎসা রুম, লাইব্রেরি, মিউজিক রুম সহ অনেক রুম। ওহ বলা হয়নি,এখানে মিউজিকের মাধ্যমেও চিকিৎসা করা হতো।এটি ছিলো বিশ্বের তৃতীয় চিকিৎসা কেন্দ্র যেখানে মিউজিকের মাধ্যমে চিকিৎসা করা হতো। ১৪৮৮ থেকে ১৮৭৮ সাল পর্যন্ত এখানে বিভিন্ন অপারেশন এবং চিকিৎসাকার্য চলতো এবং ১৯৯৭ সালে এটিকে মিউজিয়াম হিসেবে ঘোষণা করা হয়। প্রসিদ্ধ অটোমান ভ্রমণ কাহিনী লেখক এভলিয়া চেলেভি তার বইয়ে বলেছেন এখানকার শিক্ষার্থীরা ছিলো প্লেটো, সক্রেটিস, এরিস্টটল এর মত পদার্থবিদ, ফিলোসফার, বিজ্ঞানী। এখানে বৈজ্ঞানীক কলাকৌশল খাটিয়ে চিকিৎসা করা হতো।আমরা এখানে প্রায় ১২টা পর্যন্ত ঘুরে ঘুরে ইতিহাসকে অনেক কাছে থেকে দেখার সুযোগ পেলাম। আর সব থেকে বেশি অবাক লাগছে এটা দেখে যে এখানে ৬শত বছরেরও অধিক সময় আগে ব্যবহৃত জিনিসগুলো এখনো সেভাবেই রাখা আছে। আর প্রতিটি রুমে সেখানকার ইতিহাস ইংরেজি ও তার্কিসে লেখা আছে।
এর সাথে প্রতিটি রুমে তখনকার মতো করে তৈরি করে রাখা আছে প্লাস্টিকের অবয়ব যা দেখে বোঝা যায় কিভাবে চিকিৎসা করতো কিংবা ক্লাস করতো।

এরপর আবার বাসভ্রমণ এবং বাস যেখানে থামলো তার সামনে একটি নদী যার নাম “মেরিছ”। এর উপর একটি চমৎকার ব্রিজ রয়েছে যার উপর দিয়ে আমরা হেটে অপরপ্রান্তে গেলাম।পরে জানতে পারলাম এটি ঐতিহাসিক “ফাতিহ ব্রিজ”। ব্রিজের অপরপ্রান্তে কিছু রেস্টুরেন্ট এর মত দেখে সেদিকে রওনা দিলাম আমরা। উদ্দেশ্য হালকা কিছুহ খাওয়া। কিন্তু এখানেই ঘটলো বিপত্তি। যেখানে ঢুকেছি সেখানে শুধুমাত্র এলকোহল পাওয়া যায়..!!!

এরপর অন্য একটি রেস্টুরেন্ট থেকে লেবুর শরবতের মত একটি পানীয় পান করে বেড়িয়ে আবার বাসভ্রমণ। প্রায় ৩০ মিনিট পর আমরা এসে পৌছালাম “সেলিমিয়া মসজিদ” এর সামনে। সেলিমিয়া মসজিদ নির্মিত হয় ১৫৭৫ সালে এবং এর ডিজাইন করেন বিখ্যাত আর্কিটেক্ট মিমার সিনাহ। এটি তুরস্কের সবচেয়ে উঁচু মিনার (৭০.৯০মিটার) বিশিষ্ট এবং সবচেয়ে বৃহৎ গম্বুজ( ৩ অথবা ৪ ফিট) বিশিষ্ট মসজিদ। এটির নামকরণ হয়েছে সুলতান দ্বিতীয় সেলিম এর নামানুসারে। মার্বেল পাথর এবং তুরস্কের সেরা কারুকার্য খচিত মসজিদটি পর্যটকদের অন্যতম আকর্ষণ। এর পাশেই রয়েছে একটি মিউজিয়াম এবং পাশে একটি গ্রাউন্ড বাজার। যেহেতু নামাজের আরো অনেক সময় বাকি ছিলো তাই ঘুরে দেখার কিছু সুযোগ পেলাম। আমাকে মুগ্ধ করেছে এখানকার নির্মাণশৈলী।

সেলিমিয়া মসজিদের পাশে রয়েছে আরো দুটি মসজিদ। একটির নাম “এস্কি জামি” বা পুরাতন মসজিদ এবং অপরটি “বুরমালি জামি” যার বাংলা অর্থ সর্পাকার মসজিদ। তবে একটা ব্যাপার লক্ষ করলাম অটোমান সময়ে নির্মিত প্রায় সকল মসজিদই প্রায় একই ধাচে নির্মিত। হুবহু একই না হলে ইস্তাম্বুলের সোলেমানীয়া মসজিদ কিংবা অন্যান্য ঐতিহাসিক মসজিদ গুলোর সাথে একখানকার মসজিদগুলোর নির্মাণ কৌশল প্রায় একই।

আমরা যোহরের নামাজ পড়লাম বিখ্যাত সেলিমিয়া মসজিদে। এরপর দুপুরের খাবার খাবার হিসেবে খেলাম এদিরনার বিখ্যাত খাবার ” জিয়ার “। এরপর আসরের নামাজ পর্যন্ত মসজিদের আশেপাশের বিভিন্ন বাজারগুলো আমি ও আফগানী আব্দুর রশিদ সহ ঘুরলাম। বাকিরা কেউ গেছে “হাম্মাম” এ গোসল এবং রেস্ট করতে, অনেকে আবার মসজিদের ভীতরেই ঘুমিয়েছে। এখানে ঘুরতে গিয়ে একটা ব্যাপার খেয়াল হলো যে এখানে শুধুমাত্র যে লোকসংখ্যাই কম তাই নয় এখানে জিনিসের দামটাও ইস্তাম্বুল এর তুলনায় কম। একটা কোণ আইসক্রিম ইস্তাম্বুল এ ৩-৫ লিরা যেটা এখানে ১ লিরাতেই পেলাম।

বিকেল প্রায় সাড়ে পাঁচটার দিকে ফিরতি পথে রওনা দিলাম ইতিহাসের শহর এদিরনে থেকে। এরপর বাকি সময়টা রাস্তার দুধারের দৃশ্য মাঝপথে বাসের মধ্যে আরবি ও তার্কিস গান শুনতে শুনতে এবং রাতের ইস্তাম্বুল দেখতে দেখতেই কেটে যায়। অবশেষে রাত প্রায় সাড়ে আটটায় আমরা ডর্মে পৌছাই এবং সমাপ্তি ঘটে আরেকটি সুন্দর জায়গা ভ্রমণের।

Share

Share on facebook
Share on twitter
Share on linkedin
Share on pinterest
With Me

Phone: +905538859874

Email: alaminmoni.web@gmail.com

Skype: alaminmoni.web@gmail.com

whatsApp: +905538859874